নতুন প্রযুক্তি
মাছ চাষে বায়োটেকনোলজি

আমাদের দেশীয় রুই মাছ প্রথম বছরে খুব একটা বড় হয় না। যার কারণে খামারিরা এক বছর বয়সী রুই মাছের পোনা দিয়ে চাষাবাদ শুরু করেন। কিন্তু এই রুই মাছকে যদি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ট্রিপ¬য়েড করা হয় তাহলে কমপক্ষে এর বৃদ্ধি হবে প্রায় দেড়গুণ। রুই মাছের ট্রিপ¬য়েড পোনা করাও খুবই সহজ।

প্রথমে স্ত্রী মাছের পেট থেকে চাপ প্রয়োগ পদ্ধতিতে ডিম সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট সময় পর্যš- র্স্পাম মেশানোর পর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর্যš- ডিমগুলোকে রেখে দিলেই ট্রিপ¬য়েড রেনু পাওয়া যাবে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে ঊলে¬খিত পদ্ধতিতে সব পোনাই ট্রিপ¬য়েড হয় না। আর সে জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় পার হলে কোনটা ট্রিপ¬য়েড আর কোনটা ডিপ¬য়েড পোনা তা সহজেই সনাক্ত করা যায়। আর সনাক্তের কাজ শেষ করতে পারলে প্রথম বছরের ট্রিপ¬য়েড পোনা দিয়েই এক বছরে কমপক্ষে ১ কেজি ওজনের রুই উৎপাদন করা সম্ভব।

জন্মগতভাবে উন্নত দেশি শিং, কৈ, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস ইত্যাদি সাধারণভাবে উৎপাদিত মাছের মধ্যে অর্ধেক মাছ পুরুষ আর অর্ধেক মাছ স্ত্রী। এসব মাছের মধ্যে কিছু পুরুষ ও স্ত্রী মাছ বড় হয়। যে সম¯- স্ত্রী মাছ বড় হয় তার মধ্যে শিং, কৈ, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস মাছ রয়েছে। আবার কিছু পুরুষ মাছ বড় হয় যেমন: তেলাপিয়া, দেশি মাগুর ইত্যাদি। যে মাছগুলো এক বছরে বা তারও কম সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকে সে সম¯- মাছকে সহজেই বায়োটেকনোলজি প্রয়োগ করে স্ত্রী মাছে রূপাš-রিত করা সম্ভব। তিন বছরের মধ্যেই জন্মগতভাবে উন্নত স্ত্রী কৈ মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। একই পদ্ধতি অনুসরণ করে শিং, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাস মাছের স্ত্রী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব।

স্ত্রী মাছ উৎপাদন করার কৌশল সাধারণভাবে কৈ, শিং, পাবদা, পুটি, পাঙ্গাসকে প্রজনন করিয়ে রেনু উৎপাদন করার পর খাদ্য গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে ১৭ আলফা মিথাইল টেস্টোস্টেরন হরমোন প্রয়োগ করে মাছগুলোকে পুরুষ মাছে রূপাš-রিত করতে হবে।

এই মাছগুলো প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর থেকে একটি করে পুরুষ মাছ প্রজননে ব্যবহার করতে হবে এবং অই পুরুষ মাছটিকে আলাদা করে রাখতে হবে। পরবর্তীতে বাচ্চা বড় হওয়ার পর বাচ্চাগুলোকে সেক্সিং টেস্ট করে যদি সব স্ত্রী মাছ পাওয়া যায় তাহলে এই মাছের প্রজননে ব্যবহৃত পুরুষ মাছটিই হল সুপার পুরুষ এবং এই পুরুষ মাছের সাথে যেকোন স্ত্রী মাছের প্রজনন করালেই জন্মগতভাবে উন্নত সব স্ত্রী মাছ পাওয়া যাবে। এভাবে বারবার পরীক্ষা করে সুপার পুরুষ মাছ সংগ্রহ করতে হবে।

এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করে থাই কৈ মাছের সব স্ত্রী মাছ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি ব্যবহার করে শিং, পুটি সব স্ত্রী মাছের উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আশা করছি এই গবেষণাটি শেষ হলে এর যাবতীয় তথ্যাদি সাধারণ খামারির মাঝে উন্মুক্ত করার ইচ্ছা আছে। জন্মগতভাবে উন্নত এই মাছ সাধারণ মাছের চেয়ে কমপক্ষে ৭০% অতিরিক্ত উৎপাদন হয় (থাই কৈ)।

এক পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণভাবে উৎপাদিত স্ত্রী মাছের চেয়ে এ মাছের শতকরা ২০ ভাগ ওজনে বেশি হয়ে থাকে। একই প্রক্রিয়ায় পাঙ্গাস মাছের স্ত্রী মাছ উৎপাদন করতে পারলে দেশে পাঙ্গাস মাছের উৎপাদনে বিশাল আকারে বেড়ে যাবে। যদিও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ৪/৫ বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে দেশের প্রোটিন চাহিদা পূরণে সামনের দিনে বায়োটেক ফিসের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য।

 

 
ছোট মাছে পুষ্টি বেশি আয়ও বেশি

এ দেশে ছোট মাছের চাষাবাদে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৌসুমি পুকুরগুলো অতি সহজেই সাফল্যজনকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।


ছোট মাছে আছে পর্যাপ্ত পরিমাণ আমিষ, যা শরীরের জন্য অত্যাবশ্যক। বিভিন্ন শ্রেণীর খাদ্য উপাদান থেকে আমরা যে পরিমাণ আমিষ পেয়ে থাকি তা খুবই সামান্য ও দুর্মূল্য। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে মাছ চাষের অবারিত সুযোগ থাকায় মাছ থেকে আমরা অনায়াসে প্রয়োজনীয় আমিষ সংগ্রহ করতে পারি।

 

আমাদের দেশে গ্রামগঞ্জের, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিভিন্ন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের আশপাশে রয়েছে অসংখ্য মৌসুমি পুকুর-ডোবা। তা ছাড়া প্রায় প্রতিটি বসতবাড়ি সংলগ্ন একটি বা একাধিক ছোট-বড় পুকুর-ডোবা অস্তিত্বও লক্ষ করা যায়। এসব জলাশয় ছোট মাছ চাষের জন্য খুবই উপযোগী। ক্ষুদ্রায়তনের এই পুকুরগুলোতে বছরের পাঁচ-ছয় মাস পানি থাকে। বাকি মাসগুলো প্রায় পানিশূন্য অবস্খায় থাকায় এ সময় মাছ চাষ করা চলে না। তবে যে কয়েক মাস পানি থাকে, সেই মৌসুমে এই পুকুরগুলো পতিত না রেখে নিু আয়ের মানুষ তথা শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকার তরুণসমাজ সমবায়ের ভিত্তিতে সেখানে ছোট মাছের চাষ করে অর্থনৈতিকভাবে হতে পারেন স্বনির্ভর।


দেশীয় প্রজাতির ছোট মাছগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন্ধ মলা, ঢেলা, পুঁটি, টেংরা, চাপিলা, পাবদা, গুলশা, কৈ, খলিশা, বাটা, ফলি, ভেদা ইত্যাদি। ডোবা-নালা-খাল-বিলে এ মাছ সহজেই বেঁচে থাকতে পারে এবং বদ্ধ জলাশয়ে এরা পোনা উৎপাদনে সক্ষম। তাই বারবার পুকুরে মজুদ করতে হয় না। ছোট মাছ চাষে সময়ও খুব কম লাগে। মাত্র তিন মাস পরপর এ মাছ ক্রমাগতভাবে আহরণ করা যায়।

 

যথাযথ গবেষণার মাধ্যমে ছোট মাছ চাষের বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে এ মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে দেশীয় ছোট মাছ চাষের উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কিছু গবেষণামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে বলে এক সূত্র থেকে জানা গেছে।


এ ছাড়া বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট নিজস্ব উদ্যোগে কয়েকটি বিদেশী প্রজাতির ছোট মাছ যেমনন্ধ নাইলোটিকা, রাজপুঁটি এবং দেশী প্রজাতির পাবদা, কৈ, গুলশা ইত্যাদি ছোট মাছ চাষের ওপর গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

উল্লেখ্য, মলা, ঢেলা, ভেদা, ভাগনা, খলিশা, ফলি, বাটা ইত্যাদি দেশীয় ছোট মাছ চাষের উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্যাপক গবেষণাকর্ম ইফাডেপের উদ্যোগেই প্রথম শুরু হয়।


লক্ষণীয় যে, খাদ্যমান বিবেচনায় এনে চাষবাদের উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য দেশীয় ছোট মাছগুলোর মধ্যে মলা, ঢেলা, খলিশা, পুঁটি, বাটা, ভেদা, ভাগনা ইত্যাদি মাছগুলোকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। গবেষণালব্ধ ফলাফলে দেখা যায়, দেশীয় ছোট মাছ চাষের নব উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কয়েকটি প্রজাতির চাষাবাদে আশাতীত সাফল্য এনে দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য দুটি চাষ পদ্ধতি হচ্ছেন্ধ মলা মাছের একক চাষ এবং মলা, বাটা ও ভাগনার মিশ্র চাষ।


সঠিকভাবে পুকুর তৈরি করে যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে চাষাবাদ সম্পন্ন হলে, মলামাছের একক চাষে বছরে প্রতি শতাংশে ৮-১০ কেজি মাছ উৎপাদন সম্ভব। অর্থাৎ ১০ শতাংশের একটি পুকুর থেকে বছরে অনায়াসে ১০ হাজার টাকা লাভ করা যেতে পারে।


মলা, বাটা ও ভাগনা মাছের মিশ্র চাষের মাধ্যমে ১০ শতাংশের একটি পুকুর থেকে বছরে কমপক্ষে ৩-৫ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করা মোটেই কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়।


মাছের এই চরম ক্রান্তিকালে কোনো পুকুর-ডোবাই অনাবাদি না রেখে ছোট প্রজাতির মাছ চাষের ব্যবস্খা গ্রহণ করে দেশের আপামর মানুষের দৈনন্দিন আমিষ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্খানের পথ খুলে দিতে হবে।

গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে তথা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে এর কোনো বিকল্প নেই।

 

 
মিশ্র প্রজাতির মাছ চাষ

মিশ্র চাষের সুবিধা অনেক। এতে পুকুরের সব স্তরের খাবার সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়। চিংড়ির উচ্চ মূল্যের কারণে তুলনামূলকভাবে লাভ বেশি হয়। কম গভীর বা মৌসুমি পুকুরেও চিংড়ির লাভজনক চাষ করা যায়। চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে চিংড়ি বাজারজাত করা যায়। তবে এই লাভ পেতে হলে কিছু কাজ খুব ভালোভাবে করতে হবে।

মিশ্র চাষে প্রজাতি নির্বাচন :

মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে প্রজাতি নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। প্রজাতি নির্বাচন সঠিক না হলে উৎপাদন ভালো নাও হতে পারে। মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় মেনে চলতে হবে তা হলো : প্রাকৃতিক খাদ্যনির্ভর ও পুকুরে চাষযোগ্য হতে হবে। দ্রুত বর্ধনশীল হতে হবে। খাদ্য ও বাসস্খানের বিষয়ে পারস্পরিক প্রতিযোগিতা নেই এমন প্রজাতি হতে হবে। অরাক্ষুসে স্বভাবের ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি এমন প্রজাতি নির্বাচন করতে হবে। বাজার দর ভালো অর্থাৎ বাজারে ব্যাপক চাহিদা আছে এমন প্রজাতি হতে হবে। এই সব বিষয় বিবেচনা করে রুই, কাতলা, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প প্রভৃতি পুকুরে মজুদ করা ভালো।

পুকুর তৈরি :

পুকুরের উর্বরতা বৃদ্ধি, চিংড়ি পোনার যথাযথ বৃদ্ধি ও মৃত্যুহার কমানো, রাক্ষুসে মাছ দমন প্রভৃতির জন্য পুকুর তৈরি করা অপরিহার্য।


যেভাবে পুকুর তৈরি করবেন:

পুকুরের তলদেশ শুকানো :

চিংড়ি চাষ শুরু করার আগে পুকুর থেকে সব পানি বের করে ফেলতে হবে। তারপর পুকুরের তলদেশ ২ থেকে ৫ সপ্তাহ সূর্যের আলোতে শুকাতে হবে। পুকুরের তলদেশ এমনভাবে শুকাতে হবে যাতে মাটিতে ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার ফাটল সৃষ্টি হয়। তবে মাটি কষযুক্ত হলে ফাটল সৃষ্টি করা যাবে না। এ সময় পুকুরের তলদেশ ও পাড়ের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।

রাক্ষুসে মাছ দমন :

পুকুর শুকিয়ে অবাঞ্ছিত মাছ ও ক্ষতিকর প্রাণী (শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া ইত্যাদি) দূর করা যায়। যেসব পুকুর পুরোপুরি শুকানো সম্ভব না সেসব পুকুরে জাল টেনে বা ওষুধ প্রয়োগ করে রাক্ষুসে মাছ ও ক্ষতিকর প্রাণী দূর করতে হবে। তিন থেকে পাঁচ পিপিএম রোটেনন বা ১০ থেকে ২০ পিপিএম চা বীজ খৈলের সাথে প্রয়োগ করে অবাঞ্ছিত প্রাণী নির্মূল করা যায়।

চুন প্রয়োগ :

মাটির উর্বরতা শক্তির ওপর চিংড়ির ফলন নির্ভরশীল। তাই মাটি শোধন ও উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য পুকুরে চুন প্রয়োগ করা হয়। সাধারণত পুকুরে প্রতি শতাংশে ১ থেকে ১.৫ কেজি চুন গুঁড়ো করে অথবা পানিতে গুলে পুকুরের তলদেশে বা পাড়ে ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। চুন প্রয়োগের চার থেকে পাঁচ দিন পর ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পানি নার্সারিতে ঢুকাতে হবে।

সার প্রয়োগ :

চুন প্রয়োগের পর পুকুরে পানি ঢুকিয়ে পাঁচ থেকে সাত দিন অপেক্ষা করতে হবে। তারপর হেক্টরপ্রতি ৩০০ কেজি গোবর, ২৫ কেজি ইউরিয়া, ১২ কেজি টিএসপি, ৩৫ কেজি পটাশ সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে আরো পানি মিশিয়ে সব পুকুরে ভালোভাবে ছিটিয়ে দিতে হবে। সার দেয়ার পরপরই পানির গভীরতা ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়িয়ে ১ সপ্তাহ রাখতে হবে।

পানি ব্যবস্খাপনা :

পুকুরে সুষ্ঠু পানি ব্যবস্খাপনার ওপর চিংড়ির উৎপাদন নির্ভরশীল। পানি ব্যবস্খাপনার মাধ্যমে পুকুরের ভৌত রাসায়নিক ও জৈবিক পরিবেশ ঠিক রাখা যায়। ফলে চিংড়ির সন্তোষজনক উৎপাদন পাওয়া যায়। মিশ্র চাষের পুকুরে পানির গভীরতা ১.৫ থেকে ২.০ মিটার হলে ভালো হয় এবং কমপক্ষে মাসে দুবার পানি পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবার পানি পরিবর্তনের হার ২০ থেকে ৩০ শতাংশ হতে হবে। পানির স্বচ্ছতা ২৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটারের মধ্যে রাখতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্খাপনা :

মিশ্র চাষের ক্ষেত্রে চিংড়ি ও মজুদকরা রুইজাতীয় মাছের খাদ্যাভ্যাসের প্রতি দৃষ্টি রেখে খাদ্য নির্বাচন, খাদ্য তৈরি ও সরবরাহ করতে হবে।

চাষাবাদ করতে গিয়ে হঠাৎ এ বিষয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে আপনি নিকটস্খ উপজেলায় সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা অথবা উপজেলা মৎস্য অফিসারের সাথেও যোগাযোগ করতে পারেন।

 

 
ঘেরে মাছ শাকসবজি ও ধান চাষ

দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রতি ইঞ্চি জমি সারাবছর উৎপাদনশীল রাখতে হবে। একই সাথে একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদন করা এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ঘেরে একই সাথে একই জমি থেকে একই সময়ে ধান, মাছ ও সবজি চাষ করে দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি সবসময় উৎপাদনশীল রেখে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়। একই জমিতে শুধু ধান চাষ করে লাভবান হওয়া যায় না বলে সারাদেশের নিচু জমিতে ঘের তৈরি করে একই সাথে ধান, মাছ, চিংড়ি ও সবজি চাষ করে সবাই লাভবান হতে পারেন।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৩ শতাংশ বা ১ বিঘা আয়তনের জমিতে শুধু ধান চাষ করে আয় হয় ২ হাজার ২০০ টাকা। সমন্বিত ঘেরে ধান, মাছ, চিংড়ি ও শাকসবজি চাষ করে ১৯ হাজার টাকা আয় হয়, যা শুধু ধানের প্রায় ৯ গুণ বেশি। অন্যান্য সুবিধা হচ্ছেন্ধ সারাবছর পর্যায়ক্রমে পুষ্টিসহ আয়মূলক পেশায় থেকে আত্মকর্মসংস্খানের ব্যবস্খা হয়। বিনিয়োগকৃত অর্থে ঝুঁকি কম।


ঘের তৈরি :

নিচু জমি বা ধান ক্ষেতের ভেতর নালা বা গর্ত কেটে জমির চার দিকে বাঁধ দিয়ে ধান, মাছ ও শাকসবজি চাষের উপযোগী করা হয়। পাঁচ থেকে আট মাস পানি থাকে এমন জমি উপযোগী। ২০ থেকে ৫০ শতাংশ জমিতে ঘের তৈরি করলে সঠিকভাবে ব্যবস্খাপনা করা যায়। বন্যার পানির সর্বোচ্চ উচ্চতার চেয়ে ঘেরের বাঁধের উচ্চতা অন্তত আধা মিটার উঁচু, বাঁধের ওপর রাস্তা এক-দুই মিটার চওড়া এবং বাঁধের ঢাল ১:১ হতে হবে। বাঁধের মাটি যথেষ্ট এঁটেল না হলে ঢাল ১:১.৫ বা ১:২ করা যেতে পারে। এতে বাঁধ টেকসই হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কম হবে। বাঁধের ওপর চলাচল এবং শাকসবজির চাষ করা যায়। বাঁধের ভেতরের দিকে এক মিটার চওড়া একটা বকচর বা বার্ম রাখবেন, জাল টানা, খাদ্য দেয়া, চিংড়ির আচরণ পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি কাজ করা সহজ হবে। ঘেরের ভেতর চার দিকে তিন মিটার চওড়া, এক মিটার গভীরতা ও ১:১.৫ ঢালবিশিষ্ট খাল তৈরি করতে হয়। খাল বকচরের ধার ঘেঁষে হলে চিংড়ির খাবার খালের মধ্যে গিয়ে পড়বে। খাল চিংড়ির নার্সারি এবং মাছ বড় করার জন্য উপযোগী। চওড়া ও অগভীর খালে পানির সঞ্চালন থাকে বলে অক্সিজেনের অভাব হয় না। ঘেরের গভীরতা ১ থেকে ১.৫ মিটার হতে হবে। পানির গভীরতা কম হলে পানি সহজে গরম হয়, অক্সিজেনের অভাব হয় এবং ক্ষতিকর জলজ উদ্ভিদ জন্মায়। ঘের দেড় মিটারের বেশি হলে চিংড়ির খাদ্য তৈরি হয় না বরং বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হয় এবং অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। ঘেরের মূল জমির বাঁধ ও নালা হবে ২৫ ভাগ এবং চাতাল বা ধান ক্ষেত হবে ৭৫ ভাগ।


ঘেরে পানি সরবরাহ :

বেশির ভাগ ঘের বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টির পানি পর্যাপ্ত না হলে অগভীর নলকূপ দিয়ে পানি সরবরাহ করা যেতে পারে। নালা বা খালে তিন ফুটের মতো পানি থাকতে হবে। তবে প্রায় সারা বছর পানি থাকলে মাছ চাষ ভালো হয়।


ধান চাষ :

ধান রোপণের সময় ধানক্ষেতে এক-দুই ইঞ্চি পানি থাকা প্রয়োজন। স্খানীয় বা উচ্চফলনশীল জাতের ধান ঘেরে চাষ করা যায়। শক্ত কাণ্ডবিশিষ্ট ধানের জাত ঘেরের জন্য উপযোগী। প্রতি ছয়-সাত সারি অন্তর একটি সারি ফাঁকা রাখতে হবে। ফাঁকা দিয়ে চিংড়ি ও মাছ সহজেই নালা বা খালে চলাচল করতে পারে। অন্যান্য পরিচর্যা ও পদ্ধতি সাধারণ ধান চাষের মতো।


ঘেরের আইলে সবজি চাষ :

ঘেরের আইলে করল্লা, লাউ, শিম, পেঁপে, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, পুঁইশাক, কলমিশাক, পালংশাক, ডাঁটা, চিচিঙ্গা, শসা, বরবটি ইত্যাদি চাষ করা যায়। এসব সবজির মাচায় জৈবসার, ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সার দিতে হয়। মাচায় বা ভূমিতে সবজি চাষ করা যায়। ঘেরে সবজি চাষ করলে ভূমিক্ষয় রোধ হয়, ঘেরে বাঁধ ভাঙে না এবং পানি ঘোলা হয় না। অর্থাৎ শাকসবজিও পাওয়া যায় এবং মাছ চাষের জন্য উপকার হয়।


চিংড়ি ও মাছ চাষ :

খাল বা নালাতে গলদা চিংড়ি, রুই, কাতলা, সিলভার কার্প, সরপুঁটি, নাইলোটিকা, মৃগেল, ঘনিয়া ইত্যাদি মাছ চাষ করা যায়। গলদা পোনা নার্সারি থেকে সংগ্রহ করে কিংবা পকেট ঘরে লালন পালন করে ঘেরে ছাড়া যায়। এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) ঘেরে চিংড়ি পোনা ছাড়তে হবে ১ হাজার ৩২০টি এবং কার্পজাতীয় মাছের পোনা ছাড়তে হবে ৩৩০টি। পকেটে ঘেরের তলদেশের কাদা ছয় ইঞ্চির বেশি হলে তুলে ফেলতে হবে।

চিংড়ি খোলস বদলানোর সময় দুর্বল থাকে। এ সময় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্খা নিতে হবে। অন্যথায় সবল পোনা দুর্বল পোনাকে খেয়ে ফেলে। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পানিতে নারিকেলের ডাল, তালপাতা, গোলপাতা, বাঁশের কঞ্চি ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে। প্রাকৃতিক খাদ্যের জন্য পানিতে প্রতি শতাংশে এক কেজি চুন, তিন থেকে পাঁচ কেজি জৈব সার। ১০০ গ্রাম করে টিএসপি ও এমওপি সার প্রয়োগ করতে হবে। সম্পূরক খাদ্যে ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ আমিষ, গমের ভুসি, মিহিচালের কুঁড়া ও সরিষার খৈল সমপরিমাণে মেশাতে হবে।

প্রতি মাসে ঘেরের ২৫ থেকে ৫০ ভাগ পুরনো পানি পরিবর্তন করে নদী বা নলকূপের পানি দিলে চিংড়ি ও মাছের স্বাস্খ্য ভালো থাকে। ঘেরের পরিবেশে ভালো রাখলে চিংড়ির রোগবালাই হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। প্রতিবার পোনা মজুদের আগে রাক্ষুসে মাছ দমন, নিষ্কাশন, তলদেশের মাটি রোদে শুকানো, চুন ও সার প্রয়োগ করা ও পাড় মেরামত করা।

প্রতিদিন একবার বিশেষ করে সকালে ঘেরের চার পাশে ঘুরে দেখতে হবে যে, চিংড়ি বা মাছের

কোনো অস্বাভাবিক আচরণ চোখে পড়ে কি-না। দিনের বেলা চিংড়িকে ঘেরের পাড় ঘেঁষে সাঁতার কাটতে অথবা পানির মধ্যে লাফালাফি করতে দেখলে ঘেরের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পানি পরিবর্তন করতে হবে। পানি পরিবর্তন সম্ভব না হলে ঢেউয়ের সৃষ্টি করতে হবে। খাদ্য ও সার দেয়া সাময়িক বìধ রাখতে হবে।


মাছ আহরণ :

ছয় মাসে প্রতিটি চিংড়ির ওজন গড়ে ১০০ গ্রাম এবং কার্পজাতীয় মাছের ওজন গড়ে ৫০০ গ্রাম হয়। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় গলদা চিংড়ি খোলস পাল্টায়। তাই এ সময় চিংড়ি আহরণ করা ঠিক নয়।

বর্তমানে এই ঘের পদ্ধতিতে শুধু দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে মাছ, চিংড়ি, ধান ও শাকসবজির সমন্বিত চাষ হলেও সারাদেশে এর চাষ বিস্তার করা প্রয়োজন। দেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণে এই ঘেরে সমন্বিত চাষ পদ্ধতি বিরাট ভূমিকা রাখতে পারবে।

 

 
গিফট তেলাপিয়ার সুপারমেল

বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তেলাপিয়া চাষের সর্বশেষ লাভজনক প্রযুক্তি গিফট তেলাপিয়ার সুপার মেল। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।


ফিশারিজ বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের প্রফেসর ড. মো: রফিকুল ইসলাম সরদার এবং মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটির সদস্য মো: মোখলেছুর রহমান দীর্ঘ আড়াই বছর যৌথ গবেষণা শেষে এ সুপারমেল (পুরুষ) উদ্ভাবন করতে সক্ষম হন। উদ্ভাবিত সুপারমেল কোনো হরমোন প্রয়োগ ছাড়াই কৌলিতাত্ত্বিকভাবে শতভাগ মেল বাচ্চা উৎপাদন করতে পারবে। বাণিজ্যিকভাবে শতভাগ মেল বাচ্চা উৎপাদন বেশ লাভজনক।


শতভাগ মেল (পুরুষ) বাচ্চা উৎপাদনে বর্তমান যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে তা বেশ জটিল ও ব্যয় সাপেক্ষ। এ পদ্ধতিতে পুরুষ ও স্ত্রী গিফট তেলাপিয়া ১:৪ থেকে ১৮ অনুপাতে জালের তৈরি হাপার মধ্যে পুকুরে রাখা হয়। ১৫ দিন পর পর স্ত্রী মাছের মুখ থেকে নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করে তা হ্যাচারিতে ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়।


উৎপন্ন বাচ্চাকে সাধারণত প্রতি কেজি খাদ্যে ৬০ মিলিগ্রাম হারে মিথাইল টেস্টোস্টেরন হরমোন মিশিয়ে ২১ থেকে ২৮ দিন পর্যন্ত খাওয়ানো হয়। এর ফলে অধিকাংশ পোনা পুরুষে পরিণত হয়। দেশের ৮ থেকে ১০টি হ্যাচারি এ পদ্ধতি ব্যবহার করে বছরে ১৫ থেকে ২০ কোটি তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদন করছে। এ পদ্ধতিতে মেল উৎপাদনের হার প্রায় ৯০ ভাগ এবং বেশ জটিল। ড. রফিকুল ইসলাম সরদার এবং মোখলেছুর রহমান উদ্ভাবিত সুপারমেল এ জটিলতা দূর করবে এবং শতভাগ মেল বাচ্চা উৎপাদন নিশ্চিত করবে।


ড. রফিকুল ইসলাম সরদার জানান, আফিন্সকায় জন্মগত তেলাপিয়া ১৯৫৪ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে বাংলাদেশে আনা হয় এবং চাষাবাদের চেষ্টা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে তেলাপিয়ার উন্নত প্রজাতি আফিন্সকা থেকে দেশে আনা হয়। এ তেলাপিয়াই গিফট তেলাপিয়া হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।


এটি বর্তমানে দেশে থাই পাঙ্গাস মাছের পরই সর্বাধিক চাষকৃত মাছ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ড. সরদার বলেন, পুরুষ ও স্ত্রী তেলাপিয়া একসাথে চাষ করলে বংশ বিস্তার খুব দ্রুত হয়। এতে মাছের সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে এবং ব্যবস্খাপনা কঠিন হয়ে যায়। শতভাগ মেল বাচ্চা উৎপাদনে এ সমস্যা আর থাকে না। আগ্রহী তেলাপিয়া চষিরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যের জন্য ০১৭১২-০১৫৯০৮ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

 
<< Start < Prev 1 2 3 4 Next > End >>

Page 1 of 4

Newsflash

কুইক কম্পোস্ট

মাটির প্রাণ হলো জৈবপদার্থ। দীর্ঘদিন ধরেই এ দেশে ফসল চাষে নানা ধরনের জৈবসার ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গর্তে পচানো জৈবসার, গাদা করে পচানো জৈবসার ইত্যাদি পদ্ধতিতে এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে জৈবসার তৈরি ও ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রচলিত এসব পদ্ধতির একটা বড় অসুবিধা হলো আবর্জনা বা গোবর পচতে দু-তিন মাস সময় লাগে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে জৈবসার ব্যবহার করে জমিতে তা ব্যবহার করা অসুবিধাজনক। এমনকি তৈরির স্খানে এসব সার দীর্ঘদিন পড়ে থাকতে থাকতে অনেক সময় তার পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ কমে যায়, চুইয়ে নষ্ট হয়, উড়ে যায়।


তাই সম্প্রতি দ্রুত বিভিন্ন জীবজ পদার্থ পচিয়ে জৈবসারে রূপান্তরিত করার একটি নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়েছে। বিভিন্ন জীবজ পদার্থ বা আবর্জনার সমন্বয়ে দ্রুততম সময়ে পচিয়ে জৈবসার তৈরি করা হয় বলে এ সারের নাম দেয়া হয়েছে কুইক কম্পোস্ট স্বল্প সময়ে অর্থাৎ ১৫ দিনেই এ সার তৈরি ও ব্যবহার উপযোগী হয়ে যায়। তা ছাড়া এই সার অন্যান্য জৈবসারের চেয়ে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন।


বর্তমানে এসব সুবিধার কারণে পল্লী অঞ্চলে এ ধরনের জৈবসার তৈরিতে চাষিদের যথেষ্ট আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সম্প্রসারণ কর্মীরা এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তাও দিয়ে যাচ্ছেন। তৈরির উপকরণ সহজলভ্য হলে কুইক কম্পোস্টের প্রসার বাড়তে পারে বলে তার ধারণা।

উপাদান :

কুইক কম্পোস্ট তৈরি করতে লাগে খৈল, কাঠের গুঁড়া বা চালের কুঁড়া ও অর্ধপচা (ডিকম্পোজড) গোবর বা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা। এসব উপাদানের মিশ্রণ অনুপাত হবে ১:২:৪।

তৈরির পদ্ধতি :

খৈল ভালোভাবে গুঁড়া করে চালের কুঁড়া বা কাঠের গুঁড়া ও আধাপচা মুরগির বিষ্ঠা বা গোবরের সাথে উত্তমভাবে মেশাতে হবে। মিশ্রণে পরিমাণমতো পানি যোগ করে কাই বানাতে হবে, যাতে ওই মিশ্রণ দিয়ে কম্পোস্ট বল তৈরি করলে ভেঙে যাবে না; কিন্তু ১ মিটার ওপর থেকে ছেড়ে দিলে ভেঙে যাবে। মিশ্রিত পদার্থগুলো গাদা করে এমনভাবে রেখে দিতে হবে যাতে ভেতরে জলীয় বাষ্প আটকে পচনক্রিয়া সহজ হয়। গাদার পরিমাণ ৩০০-৪০০ কেজির মধ্যে হওয়া ভালো। গাদার সব উপাদান একবারে না মিশিয়ে তিন-চারবারে মেশালে ভালো হয়।

শীতকালে গাদার ওপরে ও চার দিকে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। আর বর্ষাকালে বৃষ্টির জন্য পলিথিন ব্যবহার করতে হবে এবং বৃষ্টি থেমে গেলে পলিথিন সরিয়ে ফেলতে হবে। গাদা তৈরির ২৪ ঘন্টা পর থেকে গাদার তাপমাত্রা বাড়তে থাকে এবং ৪৮-৭২ ঘন্টার মধ্যে ৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পৌঁছায়। অর্থাৎ গাদায় তখন আঙুল ঢুকালে অসহনীয় তাপমাত্রা অনুভূত হবে (৬০-৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এর ফলে সৃষ্ট তাপে মিশ্রিত পদার্থ পরে নষ্ট হতে পারে। তাই গাদা ভেঙে ওলটপালট করে ১ ঘন্টা সময়ের জন্য মিশ্রণকে ঠাণ্ডা করে নিতে হবে এবং পুনরায় আগের মতো গাদা করে রাখতে হবে।

এভাবে ৪৮-৭২ ঘন্টা পরপর গাদা ভেঙে ওলটপালট করতে থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে ওই দ্রুত মিশ্র জৈবসার জমিতে প্রয়োগের উপযোগী হবে। সার তৈরি হলে তা ঝুরঝুরে শুকনো এবং কালো বাদামি রঙ হবে।

প্রয়োগ মাত্রা :

জমির উর্µরতা ও ফসলভেদে প্রতি শতাংশে প্রায় ৬-১০ কেজি কুইক কম্পোস্ট সার ব্যবহার করতে হয়। ফসলের জমি তৈরির সময় প্রতি শতাংশে ৬ কেজি এবং কুশি পর্যায়ে সেচের আগে ২ কেজি করে উপরি প্রয়োগ করা যেতে পারে।

সবজি ফসলের ক্ষেত্রে জমি তৈরির সময় প্রতি শতাংশে ৬ কেজি এবং ৪ কেজি সার রিং বা নালা করে সবজি বেডে প্রয়োগ করতে হয়। সার প্রয়োগের পর সেচ দিতে হয়।

পুষ্টিমান :

কুইক কম্পোস্ট সারে নাইট্রোজেন ২ দশমিক ৫৬ শতাংশ, ফসফরাস ০ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও পটাশিয়াম ০ শতাংশ ৭৫ শতাংশ পাওয়া যায়। এ ছাড়াও ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও কিছু গৌণ খাদ্য উপাদান থাকে।

ব্যবহারের উপকারিতা :

কুইক কম্পোস্ট সার ব্যবহারের ফলে মাটিতে বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পায়, অণুজীবের ক্রিয়া বাড়তে থাকে, ফসলের প্রয়োজনীয় সব খাদ্যোপাদান সহজলভ্য হয়। ফলে আশানুরূপ ফলন পাওয়া যায় এবং গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন সম্ভব হয়।